লাইসেন্স বা নিবন্ধন ব্যতীত অবৈধভাবে ই-কমার্স ব্যবসা পরিচালনা করলে তিন বছরের কারাদণ্ড বা অনধিক ৩ লাখ টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করার বিধানের সুরপারিশ করেছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ।
এই সুপারিশের ভিত্তিতে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনের সংশোধনীতে নতুন এই ধারা সংযোজন হতে যাচ্ছে।
অবৈধ ব্যবসা বন্ধে আইনে এ সংযোজন করতে হচ্ছে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরকে। সংস্থাটি ভোক্তার স্বার্থ রক্ষায় ২০১০ সাল থেকে পণ্য ও সেবা খাতের সার্বিক বিষয়ে তদারকির জন্য আইন অনুযায়ী পদক্ষেপ নিচ্ছে। কিন্তু ই-কমার্স খাতে প্রতারণার অনেক অভিযোগ দিয়ে আসছেন ভোক্তারা। এক্ষেত্রে বিদ্যমান আইনে ডিজিটাল কমার্স প্রতারণার বিষয়ে কোনো বিধান নেই। এ কারণে ডিজিটাল কমার্স ব্যবসার ক্ষেত্রে অপরাধীদের শাস্তির আওতায় আনতে এ সংযোজন হচ্ছে।
দীর্ঘদিন ধরে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন সংশোধনের প্রক্রিয়া চলছে। এখন এই আইনের সংশোধনীতে ডিজিটাল কমার্স সংক্রান্ত বিষয়গুলো অন্তর্ভূক্ত করা হচ্ছে। সংশোধিত আইনের খসড়ায় ১৫টি ধারা ও উপধারা নতুন সংযোজন হচ্ছে।
খসড়া সংশোধনীতে বলা হয়, নিবন্ধন বা লাইসেন্স ছাড়া ডিজিটাল কমার্স ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করতে পারবে না। এর যৌক্তিকতা হিসেবে বলা হয়, কোন প্রকার ভৌগোলিক ঠিকানা, নাম, যোগাযোগের মাধ্যম ছাড়া বিভিন্ন প্রকার ডিজিটাল প্লাটফর্ম ব্যবহার করে বিভিন্ন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান ডিজিটাল কমার্স ব্যবসা পরিচালনা করছে। এর ফলে ভোক্তারা প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী পণ্য ও সেবার ক্ষেত্রে প্রতারিত হচ্ছেন এবং আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। ই-কমার্স ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো নিবন্ধনের আওতাধীন হলে তাদেরকে মনিটরিং এবং নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হবে। এ জন্য আইনের ধারায় যুক্ত হচ্ছে, ডিজিটাল কমার্স প্রতিষ্ঠান বা সহায়তা দেওয়া প্রতিষ্ঠানের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী পণ্য ও সেবা যথাযথভাবে না দিলে অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।
আইনের নতুন সংযোজনের খসড়ায় বলা হয়, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে পণ্য ও সেবার কারিগরি বিনির্দেশ, বিবরণ, আকার, পরিমাণ ইত্যাদি থাকতে হবে। এসব প্রকাশ করা না হলে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের স্বত্বাধিকারী বা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের বিক্রেতাকে দুই বছরের জেল বা অনধিক ১ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করতে পারবে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর।
ডিজিটাল বিজনেস আইডেনডিটি (ডিবিআইডি) প্রদর্শন ছাড়া কোন ডিজিটাল বাণিজ্য প্রতিষ্ঠান বাণিজ্য পরিচালনা করলে ওই প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট ও সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে পরিচালনা করলে তিনি ১ বছরের জেল বা ১ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। একই শাস্তির আওতায় থাকবেন সেবার মূল্য তালিকা সংরক্ষণ ও প্রদর্শন না করলে।
আইন সংশোধনীর খসড়ায় ডিজিটাল কমার্সের সংজ্ঞা নির্ধারণ করা হয়েছে, ইলেকট্রনিক বা ডিজিটাল বাণিজ্য যা ইন্টারনেট ও অন্যান্য ডিজিটাল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহার করে সম্পাদিত বাণিজ্যিক কার্যক্রম বা পণ্য ও সেবা কেনাবেচা।
লাইসেন্স ছাড়া ই-কমার্স ব্যবসা পরিচালনা হলে ভোক্তাদের অধিকার চরমভাবে লঙ্ঘিত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়। এ কারণে ভোক্তা অধিকার ক্ষুণ্ন হলে এর বিরুদ্ধে প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নির্ধারণ ও গ্রহণ করার ক্ষমতা দেওয়া হচ্ছে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে। ভোক্তার অধিকার বিরোধী কার্যের জন্য ডিজিটাল কমার্স প্রতিষ্ঠান, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, ফ্যাক্টরি, কারখানা, গুদাম সাময়িকভাবে বন্ধ করার নির্দেশ দিতে পারবেন মহাপরিচালক।
ডিজিটাল কমার্স পরিচালনায় ভোক্তা অধিকারবিরোধী কোন কাজ সংঘটিত হচ্ছে এমন প্রতীয়মান হলে মহাপরিচালক বা তার ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ডিজিটাল কমার্স প্ল্যাটফর্ম, ডিজিটাল ডিভাইস, ওয়েবসাইট, ডিজিটাল নেটওয়ার্ক, অ্যাপস বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশিত বা প্রচারিত তথ্যের বিষয়ে অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিয়ে ত্রুটি-বিচ্যুতি পরিলক্ষিত হলে ডিজিটাল কমার্স পরিচালনায় ব্যবহার করা সব মাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য সাময়িক বা স্থায়ীভাবে বন্ধ বা মুছে ফেলার জন্য কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করতে পারবে।
আইনের খসড়া সংশোধনীতে বলা হয়, ভোক্তা অধিকারবিরোধী কার্য প্রতিরোধের ক্ষেত্রে এসব অপরাধ করলে অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট জরিমানা আরোপ, ব্যবসার লাইসেন্স বাতিল, ব্যবসায়িক কার্যক্রম সাময়িক বা স্থায়ীভাবে স্থগিত করতে পারবে। একই সঙ্গে ত্রুটিপূর্ণ পণ্য যথাযথ পণ্য দ্বারা প্রতিস্থাপন বা ত্রুটিপূর্ণ পণ্য ফেরত গ্রহণ করে পণ্যের মূল্য ক্রেতাকে ফেরত দিতে এবং ডিজিটাল কমার্স প্রতিষ্ঠানের প্রতিশ্রুত পণ্য সরবরাহ বা অগ্রিম অর্থ ফেরত দেওয়া সম্পর্কিত প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিতে পারবেন।
ভোক্তা অধিকার ও প্রতিযোগিতা কমিশন আইনের মাধ্যমেই দেশের ই-কমার্স খাতে শৃঙ্খলা আনা সম্ভব বলে মনে করে ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ই-ক্যাব)। গত ফেব্রুয়ারিতে খসড়া ডিজিটাল বাণিজ্য আইন, ২০২৩’ নিয়ে অনুষ্ঠিত এক সভায় এই মত তুলে ধরেছে সংগঠনটি। ই-ক্যাব সভাপতি শমী কায়সার বলেন, চুরি মানেই চুরি। এটা অনলাইন বা অফলাইনে আলাদা করার দরকার নেই। ভোক্তা অধিকার আইনের মাধ্যমে শাস্তি দেওয়া সম্ভব। প্রয়োজনে ওই আইনের সংশোধন করলেই হবে।
দেশে দ্রুত ই-কমার্স ব্যবসার সম্প্রসারণ হচ্ছে। আগামী ২০২৪ সালে এ বাণিজ্য তিন হাজার কোটি টাকা ছাড়াবে। ই-কমার্স সম্প্রসারণের পাশাপাশি প্রতারণাও বাড়ছে। যদিও প্রতারণা বন্ধে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে কিছুটা উদ্যোগ নিয়েছে। তবে ডিজিটাল বাণিজ্য কর্তৃপক্ষ গঠন হলে আরও কার্যকর পদক্ষেপ থাকবে বলে মনে করেন ই-কমার্স ক্রেতারা।