The Business Post
শনিবার, জুলাই ২৪, ২০২১

প্রচ্ছদ বাণিজ্য

২৩ জুলাই ২০২১ ২০:২০:২১

শরবত বেঁচে লাখপতি জহিরুল

শরবত বেঁচে লাখপতি জহিরুল

কাজী মাহবুবুর রহমান

জীবনযুদ্ধে হার না মানা এক যুবকের নাম জহিরুল ইসলাম। ভ্যান গাড়িতে শরবত বিক্রি করেই হয়েছেন লাখপতি। রাজধানীর মিরপুর-৬ নম্বর বাজার মসজিদ সংলগ্ন রাস্তায় দীর্ঘ ৮ বছর ধরে বিক্রি করছেন শরবত। তার শরবতের নিয়মিত ক্রেতা অনেকেই। যান্ত্রিকতার নগরীতে জহিরের এই শরবত পান করে খুশি পথচারীরা।

কিন্তু তার এ পথ চলা এতটা সহজ ছিল না। সেই সংগ্রাম ও সফলতার গল্পই দ্য বিজনেস পোস্ট এর সাথে আলাপকালে তুলে ধরেন জহিরুল।

ভোলা সদর উপজেলার ছেলে জহির। অল্প বয়সে হারান বাবাকে। অথৈ সাগরে পড়ে তার পরিবার। শুরু হয় তার জীবনযুদ্ধের গল্প।

খেয়ে না খেয়ে দিন চলতো তাদের। অভাবের সংসারে হঠাৎ করেই বড় বোনের বিয়ে হয়ে যায়। লেখাপড়ার পাশাপাশি অল্প টাকা বেতনে শুরু করেন চাকরি। কোনোমতে চলতো সংসার। ২০১১ সালে এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছিলেন। কিন্তু অকৃতকার্য হন সেখানে।  

সংসারের হাল ধরতে কাজের খোঁজে মামার হাত ধরে ভোলা থেকে পাড়ি জমান রাজধানী ঢাকায়। তখন থেকেই আছেন মিরপুরে। অল্প বেতনে একটি চাকুরিতে যোগ দিলেও স্বপ্ন ছিল নিজে কিছু একটা করার। কিন্তু পুঁজির অভাবে সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে পারছিলেন না।

ঢাকায় আসার পর পরিচয় হয় ভ্যানগাড়ি তৈরি করে এমন এক ব্যক্তির সঙ্গে। চাকুরি করে কিছু টাকা জমানোর পর একদিন ওই ব্যক্তির কাছে নিজের ইচ্ছের কথা তুলে ধরেন জহির।

ওই ব্যক্তির সহযোগিতায় একটি শরবতের ভ্যান গাড়ি তৈরি করেন। খরচ হয় এক লাখ বিশ হাজার টাকা। কিন্তু এত টাকা একসাথে পরিশোধ করা সম্ভব ছিল না তার পক্ষে। প্রথমে নিজের কিছু জমানো টাকা দেন, পরে বাকি টাকা আস্তে আস্তে পরিশোধ করেন।

ভ্রাম্যমাণ দোকানের নাম দিয়েছেন ‘বিসমিল্লাহ ফলের শরবত’। যার স্লোগান “আসেন ভালো কিছু খাই, রং স্যাকারিন নাই।”

জহিরুল ইসলাম বলেন: 'জীবনে অনেক কষ্ট করে আজ এখানে আমি। তবে আমার চলার পথ খুব সহজ ছিল না। আমার জীবনের শুরুটা ছিল বেদনার আর যুদ্ধের। তবে এখন আমি ভালো আয় করছি। 

শিশু বয়সেই মারা যান জহিরের বাবা। বাবার মৃত্যুর পর দিশেহার হয়ে পড়ে তার পরিবার। দুই বোন আর মা নিয়ে ছিল তাদের সংসার। সংসারের হাল মা আর বড় বোন ধরেছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই বড় বোনের বিয়ে হয়ে যায়। মা একা হিমশিম খাচ্ছিলেন সংসার চালাতে। মায়ের কষ্ট সইতে না পেরে জহির হাল ধরেন সংসারের।'

জহির বলেন: 'নিজের এলাকায় পড়ালেখার পাশাপাশি একটি বেসরকারি কোম্পানিতে অল্প বেতনে চাকুরি শুরু করেছিলাম। দুই বছর যাওয়ার পর দেখি, যা আয় করি সংসারের আর পড়ালেখার খরচ চলে না। ২০১১ সালে এইচএসসি পরীক্ষায় পাস না করায় মামার সঙ্গে ঢাকায় চলে আসি। এরপর একটি চাকুরি করি। কিন্তু স্বপ্ন ছিল নিজে কিছু করার। তাই এক ভাইয়ের সহযোগিতায় এই গাড়িটি তৈরি করি। খরচ পড়ে এক লাখ বিশ হাজার টাকা। প্রথমে কিছু টাকা দিয়েছিলাম। পর আস্তে আস্তে বাকি টাকা পরিশোধ করি। আমার এই অবস্থানে আসার পেছনে ওই ভাইয়ের অবদান আছে। উনি সহযোগিতা না করলে কি হত জানি না। আমি তার কথা কখনও ভুলতে পারব না।'

আয় সম্পর্কে জানতে চাইলে উত্তরে তিনি বলেন: 'আমার এখানে দুই ধরেন শরবত পাওয়া যায়। একটি লেবুর শরবত ও অন্য ইসপগুল সাথে ফলমিশ্রিত শরবত। প্রতিদিন ৫০০ থেকে ৬০০ গ্লাস বিক্রি হয়। প্রতি গ্লাসের দাম ১০ টাকা। এতে ভালোই আয় হয়। আমার শরবতের নিয়মিত ক্রেতা আছে। অনেকে বোতলে করে পার্সেল নিয়ে যায়। তবে এই করোনায় একটু বিক্রি কমে গেছে। পাশাপাশি শরবত বানানো উপকরণের দামটাও একটু বাড়তি।'

নিজের সংসার হয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন: 'বাবা মারা যাওয়ায় পরিবারের হাল ধরতেই কাজে নেমে পড়া। এটাই আমার সংসার। নিজের আয়ের টাকা দিয়ে ছোট বোনকে বিয়ে দিয়েছেন। মা বড় বোনের কাছে থাকে। ওখানে খরচ পাঠাই। এখনো বিয়ে করিনি। এখন সঞ্চয় করছি। নিজেকে আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই।'

ব্যবসা করতে কোনো সমস্যা হয় কিনা, উত্তরে জহির বলেন: 'রাস্তায় ব্যবসা করি। সমস্যাতো থাকবেই। প্রতিদিন এই জায়গায় ব্যবসা করতে দুইশ টাকা খরচ হয়।'

তিনি বলেন: 'আমার শরবতের ক্রেতা রিকশাওয়ালা থেকে শুরু করে সব শ্রেণি পেশার মানুষ। আমি চাই পরিষ্কার ও স্বাস্থ্যসম্মত শরবত বিক্রি করতে। এতে ক্রেতার সংখ্যা বাড়ে।'

জহিরের দোকানে শরবত খেতে আসা আজিজুল নামে এক ব্যক্তি বলেন: 'এখানে আমি প্রায়ই ফলের শরবত খাই। প্রতি গ্লাস ১০ টাকা নেয়। এক কথায় যদি বলি ‘ভালো’। দোকানটা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। এখানে অনেকদিন ধরে ব্যবসা করছে। ব্যবহারও ভালো।'

দোকানের পাশের মসজিদটি দেখিয়ে রবিন নামে এক ব্যক্তি বলেন: 'আমি এই মসজিদে নিয়মিত নামাজ পড়ি। নামাজ পড়তে আসলেই জহিরের দোকানের শরবত খাই। অনেক সময় বাসায় অন্যদের জন্য নিয়ে যাই।'