The Business Post
শনিবার, সেপ্টেম্বর ২৫, ২০২১

প্রচ্ছদ জাতীয়

২৪ সেপ্টেম্বর ২০২১ ২০:৪৩:৩২

শামুক দিয়ে মাছের খাদ্য, চাষিদের খরচ কমবে অর্ধেক

শামুক দিয়ে মাছের খাদ্য, চাষিদের খরচ কমবে অর্ধেক

মোহাম্মদ আইয়ুব আলী

বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদিত বিভিন্ন কোম্পানির মাছের খাদ্যের দাম বেশি হওয়ায় স্বল্প বিনিয়োগ করা মৎস্য চাষিরা পড়েন বিপাকে। তাই উৎপাদন খরচ কমাতে খোঁজেন বিকল্প পথ।

এরই অংশ হিসেবে ময়মনসিংহের এক মৎস্য চাষি সফলভাবে শামুকভিত্তিক মাছের খাদ্য তৈরি করেছেন; যা ব্যবহার করলে মাছের উৎপাদন খরচ প্রায় অর্ধেকই কমে আসবে।

শামুকভিত্তিক মাছের খাদ্য তৈরিতে সফল ওই মৎস্য চাষি হলেন, ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা উপজেলার আবু রেজা মাহবুবুল হক শাহিন।

দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় জেলাগুলোর ঘেরে দীর্ঘদিন ধরেই শামুকের মাংস চিংড়ির খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করে আসছেন চাষিরা। কিন্তু মাহবুবুলের তৈরি ওই খাবারে পুরো শামুকই রয়েছে।

এ খাদ্য উৎপাদনের পর তিনি দেশীয় মাছের প্রজাতি, যেমন ক্যাটফিশ চাষে এরই মধ্যে সফলও হয়েছেন।

মাহবুবুল বলেন, শামুক-ভিত্তিক খাবারের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে, যদি এটি মাছ চাষিদের মাঝে জনপ্রিয় করে তোলা যায়। কারণ, এটি মাছ উৎপাদনের খরচ কমিয়ে আনে প্রায় অর্ধেক।

তিনি বলেন, এক কেজি মাছের খাবার এখন বাজারে ১৮ থেকে ২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, কিন্তু এক কেজি শামুক ভিত্তিক মাছের খাবারের দাম প্রায় অর্ধেক, মাত্র ১১ টাকা।

শামুকভিত্তিক এ খাবারের উৎপাদক মাহবুবুল জানান, একদিন তিনি দেখেন তার পুকুরে চাষ করা মাছগুলো অস্বাভাবিকভাবে পুষ্ট, যার কারণ খুঁজতে গিয়ে তিনি ওই মাছের পেটে শামুকের অংশ খুঁজে পান।

এরপর তিনি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীদের সাথে আলোচনা করে শামুক সংগ্রহ করে শামুক ভিত্তিক খাদ্য তৈরি করেন এবং তা তার মাছের খাদ্য হিসেবে ব্যবহারের পর ভালো ফলাফলও পান।

তারপর থেকে মাহবুবুল তার মাছকে শামুক-ভিত্তিক খাদ্য খাওয়াচ্ছেন, এতে কমেছে উৎপাদন খরচও। বর্তমানে তিনি তার মাছের খাবারের মধ্যে ৫০ শতাংশই খাওয়ান শামুক-ভিত্তিক খাবার।

এ উদ্যোক্তা বলেন, শামুকভিত্তিক খাবার মাছের জন্য সুস্বাদু। তার খামারে মাছের খাদ্য উৎপাদনের জন্য এখন একটি শামুক চাষ প্রকল্পও রয়েছে।

আগে থেকেই বাংলাদেশের মাছ চাষে শুকনো মাছ প্রোটিনের উৎস হিসেবে ব্যবহৃত হয়, যা তুলনামূলকভাবে দাম বেশি। তাছাড়া, দীর্ঘ সময় সংরক্ষণের জন্য এসবে প্রায়ই ক্ষতিকর রাসায়নিক মেশানে হয়।

ময়মনসিংহের বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের জলচাষের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মাহফুজুল হক বলেন, মাছ চাষের ৭০ শতাংশই খরচ হয় কেবল মাছের খাবারে।

তিনি বলেন, খামারের খরচ কমাতে পারলে কৃষকরা বেশি লাভবান পাবেন। শামুকভিত্তিক মাছের বিকল্প খাদ্যকে জনপ্রিয় করার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন মাহফুজুল হক।

এক কিলোগ্রাম শামুক ভিত্তিক খাবারের দাম প্রায় ১১.৫ টাকা। এই দামের মধ্যে রয়েছে, চালের ভুসি, সরিষার খৈল, শামুকের গুঁড়া, ভিটামিন, লবণ, শ্রমিকদের বেতন এবং মেশিনের চার্জ।

কৃষকরা যদি শামুকের তৈরি খাদ্য ব্যবহার করেন, তাহলে মাছের খাদ্য তৈরিতে মাংস ও হাড়ের আমদানি কমবে এবং অর্থ সাশ্রয় হবে বলেও জানান মাহফুজুল।

শামুকভিত্তিক মাছের খাবার তৈরিতে প্রথমে তাজা শামুক সংগ্রহ এবং সেগুলো ধানের তুষের সাথে মিশিয়ে একটি ফিড প্লেট মেশিনে গুঁড়ো করা হয়। মিশ্রণটি রোদে শুকানো হয় এবং খাইল গ্রাইন্ডিং মেশিন দ্বারা আবার চূর্ণ করা হয়। চূড়ান্ত পাউডারই হলো মাছের খাবার।

অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মাহফুজুল হক জানান, খুলনা, বাঘেরহাট, যশোর, সাতক্ষীরা এবং নড়াইলে চিংড়ির ঘেরগুলোতে শামুকের মাংস খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয় এবং তাদের প্রতিদিন গড়ে হেক্টরপ্রতি ৬৫.৫ কেজি শামুকের মাংস প্রয়োজন।

তিনি বলেন, প্রায় ১৫ হাজার নারী-পুরুষ সরাসরি ওসব জেলায় শামুক তোলার সঙ্গে জড়িত এবং চিংড়ি চাষের মৌসুমে প্রতিদিন তারা ৪ থেকে ৫ ঘণ্টার কাজ ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা মজুরি পান। খাদ্য হিসেবে সামুক ব্যবহার বিজ্ঞান তথা হেলিকালচারে বিপুল সংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থানেরও সুযোগ রয়েছে বলে মনে করেন ড. মোহাম্মদ মাহফুজুল হক ।

এ অধ্যাপক বলেন, হেলিকালচার একটি লাভজনক ব্যবসা হতে পারে। কারণ, এটি মঙ্গোলয়েডদের (এশিয়া, পলিনেশিয়া ও আমেরিকান আদিবাসী সম্প্রদায়) মধ্যে একটি জনপ্রিয় খাবার।

বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ শামুক খায়। মিষ্টি পানির আপেল শামুকের বিশ্বব্যাপী প্রচুর চাহিদা রয়েছে। কারণ, এতে উচ্চ প্রোটিন, চর্বি, ভিটামিন এবং খনিজ রয়েছে।

একটি ১২০ ডেসিমেল পুকুরে ৪৫ দিনে ২ হাজার কিলোগ্রাম শামুক উৎপাদন করা যায়, বলেন এ বিশেষজ্ঞ।

তিনি আরও বলেন, ২৫০ গ্রাম গোবর, ২৫০ গ্রাম খৈল এবং ১০০ গ্রাম ইউরিয়া কম্পোস্টের সাথে মিশিয়ে পরপর তিন দিন প্রতি ডেসিমেল স্থানে ছিটিয়ে দিতে হবে শামুকের খাদ্য হিসেবে।