The Business Post
শনিবার, সেপ্টেম্বর ২৫, ২০২১

প্রচ্ছদ জাতীয়

২৪ সেপ্টেম্বর ২০২১ ২০:৪৩:৩২

সংসারে পিষ্ট নারীর ক্যারিয়ার

সংসারে পিষ্ট নারীর ক্যারিয়ার

আফরিন আপ্পি

তিন সন্তানের জননী সায়মা রহমান। পারিবারিকভাবে বিয়ের পিঁড়িতে বসেন ২০১২ সালে। সেসময় সায়মা মাত্র উচ্চ মাধ্যমিকের শিক্ষার্থী। ইচ্ছে ছিলো লেখাপড়া শেষ করে সরকারি চাকরি করার। বিয়ের সময় পাত্রপক্ষ রাজিও হয় পড়ানোর শর্তে।

বিয়ের এক বছরের মাথায় গর্ভবতী হন সায়মা। বসা হয় না উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায়। এরপর সন্তান লালন-পালনে সংসারের কাজে রাতদিন ব্যস্ত সময় কাটতে থাকে তার। এরই মাঝে সন্তানের বয়স যখন দেড় বছর তখন পুনরায় চেষ্টা করেন কলেজে যাবার। কিন্তু মাসখানেকের ভেতর নিজের ভেতরে অনুভব করতে থাকেন আরেকটি প্রাণের অস্তিত্ব।

পেরোনো হয় না উচ্চমাধ্যমিকের গণ্ডি। ছোট দুই সন্তান নিয়ে সংসার সামলে নিজের জন্য সময় মেলে না সায়মার। বর্তমানে তিনি ৩ সন্তানের জননী। উদয়াস্ত সন্তানদের দেখভাল করে আর সংসার সামলে কাটে তার।

এ গল্প শুধু সায়মার নয়। সায়মার মত এমন হাজার হাজার নারীর। সংসারের চাপে নিভে গেছে যাদের স্বপ্ন। ক্যারিয়ার নিয়ে আকাশসম স্বপ্ন থাকলেও তা রূপ পায়নি বাস্তবে। মেধাবী এ নারীদের সব ভাবনা এখন সংসারের হলুদ-মরিচ আর চাল-ডালের সাথে মিশে এক হয়ে গেছে।

এমনই আরেক নারী রুবী হোসেন। ভালোবেসে ঘর বেঁধেছিলেন। স্বপ্ন দেখতেন লেখাপড়া শেষ করে নিজ পায়ে দাঁড়াবার। সে পথে অনেকটা এগিয়েও গিয়েছিলেন। তবে সন্তান জন্মের পর ভাটা পড়ে সে স্বপ্নে। বাসায় কার কাছে রেখে যাবেন ছোট্ট শিশুটিকে? এরপর স্বামীর কথামতো ছেড়ে দেন চাকরি। সন্তানের বয়স যখন ৫ তখন আবার একটি স্কুলের শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেন। ততোদিনে রুবীর ঘর আলো করে এসেছে আরও একটি কণ্যা সন্তান। সারাদিন স্কুলে থাকায় সন্তানদের সময় দিতে পারছিলেন না সেভাবে। গৃহকর্মীর কাছে থাকতে থাকতে সন্তান হয়ে উঠছিল বদমেজাজী, রুক্ষ। আর তাই সন্তানের ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করে বাধ্য হয়েই ছেড়ে দেন চাকরি।

সায়মা ও রুবীর মতো নারীরা প্রতিদিন নিজের স্বপ্ন ও আকাঙক্ষাকে জলাঞ্জলী দিয়ে গৃহস্থলির সেবামূলক কাজে নিয়েজিত করছেন নিজেদের। এর কোনো অর্থমূল্য না থাকলেও আক্ষেপ নেই তাদের। চাকরির সুযোগ পেয়েও ঘর সামলাতে গিয়ে পেরে উঠছেন না তারা। 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন; পুুরুষরা কর্মজীবি নারীদের কাছ থেকে শতভাগ সেবাটাই আশা করেন যেমন আশা করেন একজন গৃহিণীর কাছ থেকে। আর সেখান থেকেই শুরু হয় দ্বন্দ্বটা। মেয়েটি যখন সেই শতভাগ চাওয়া-পাওয়া পূরণ করতে না পারে তখন নিজের স্বপ্নের সঙ্গে আপোষ করে গুটিয়ে নেয় নিজেকে। যে মেয়েটি গবেষক হতে পারতো সে ব্যস্ত হয়ে পড়ে বাজারের ফর্দ লিখতে। সন্তান কখন কী খাবে? পরিবারের সদস্যদের কার কী পছন্দ-অপছন্দ এসবের সঙ্গে মানিয়েই কাটতে থাকে তার দিন। এভাবে সে ভুলতে বসে নিজের পরিচয়। হয়ে ওঠে কারো স্ত্রী কারো মা। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. শাহ এহসান হাবীব দ্য বিজনেস পোস্টকে বলেন: আমাদের সমাজে গৃহিণী পেশাটাকে কন্ট্রোভার্শিয়াল হিসেবে দেখা হয়। এটাকে আমরা পেশা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে চাই না। নারীর নিজেদের মেধা যোগ্যতা ও দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে চাকরিতে যোগ দিলেও দেখা যায় একটা সময় পর সংসারের চাপে তাদের সেখান থেকে সরে আসতে হয়। তবে এর পেছনে শুধু পৃুরুষতান্ত্রিক মানসিকতাই দায়ী নয়। দায় আমাদের রাষ্ট্র ব্যবস্থারও। এখানে সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়টি জড়িত। উন্নত দেশগুলোতে দেখা যায় সন্তানদের স্কুলে আনা-নেয়াসহ যাবতীয় দায়িত্ব স্কুল কতৃপক্ষ পালন করে। সেক্ষেত্রে বাবা-মা দু’জনেই স্বাধীন। কিন্তু আমাদের দেশে দেখা যায় জেন্ডার ইস্যুর কারণে এ দায়িত্বগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নারীর উপর পড়ে।

‘নিজস্ব মেধা, স্বাতন্ত্র্যবোধ, আইডেনটিটি চাইলেও জেন্ডার রোলের কারণে নারীকে বাড়তি দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। এবং তাদের অবস্থান থেকে সরে আসতে হচ্ছে। অনেকক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে এসব নিয়ে নারীরা সহিংসতার শিকার হচ্ছে। এর ফলে ঘটছে বিবাহ বিচ্ছেদের মত ঘটনাও।’

যারা চাকরি করছেন তাদের ক্ষেত্রেও দেখা গেছে নানা শর্ত। কর্মক্ষেত্র থেকে রাতে বাসায় ফিরে রান্না করতে হবে। বাচ্চাদের দেখভাল করাসহ শ্বশুরবাড়ির আত্মীয়দের আপ্যায়ন, সংসারের সব কাজ করতে হবে সুনিপুণ হাতে। কোথাও কোনো কমতি থাকা যাবে না।

কিছুটা আক্ষেপের সুরে রাজধানীর একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত সারজাম বলেন; ‘অফিস থেকে বাসায় ফিরে আমাকে সরাসরি যেতে হয় রান্নাঘরে। আর আমার স্বামী টিভির রিমোর্ট নিয়ে ড্রইংরুমে বসে পড়েন। আমি রান্না শেষ করে টেবিলে খাবার দিলে তারপর তিনি খেতে আসেন। আমিও বাইরে থেকে চাকরি করে ক্লান্ত হয়ে ফিরি তিনিও ফেরেন কিন্তু অবস্থা দেখে মনে হয় আমি সারাদিন বাসায় ছিলাম। আর আমি মেয়ে বলে সব কাজ আমাকেই করতে হবে।’

এজন্য পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতাকে দায়ী করেন তিনি। সারজামের অভিযোগ ৮ ঘণ্টা অফিস করে ২ ঘণ্টার জ্যাম ঠেলে বাসায় ফিরে ক্লান্ত-বিধ্বস্ত অবস্থায় এত কাজ করার পরও স্বামীর তরফ থেকে অভিযোগের শেষ নেই। এটা কেনো হলো না। ওটা কেনো অগোছালো। সেটা কেনো খেতে খারাপ হলো এ ধরনের নিত্য-নতুন অভিযোগ লেগেই থাকে। 

মানবাধিকার কর্মী খুশি কবির বলেন; ‘সংসার বিষয়টি এমন যা সবাই মিলে হয়। তবে এখানে মেয়েরা স্যাক্রিফাইস করছে। এর কারণ হলো আমোদের সামাজিক বদ্ধমূল ধারণা। পরিবার, নারীদের মানসিকতা। এখনও সেই প্রচলিত নিয়ম চলে আসছে; যে নারীদেরই সংসারের সব কাজ করতে হবে। এসব ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সমান অংশগ্রহণ থাকলে নারীদের চাকরি ছাড়তে হতো না।’

তিনি বলেন: ‘নারীর পাশাপাশি পুরুষেরও ছাড় দেয়ার মানসিকতা থাকতে হবে। প্রচলিত বদ্ধমূল ধারণা থেকে সবাইকে বেরিয়ে আসতে হবে।’

তবে কী পরিমাণ নারী সংসার সামলাতে গিয়ে কারণে চাকরি ছাড়ছেন এ বিষয়ে কোনো জরিপ পাওয়া না গেলেও বেসরকারি সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় করোনাকালে ধর্ষণের পরই সবচেয়ে বেশি পারিবারিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে।

গত বছর পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়েছেন ৫৫৪ জন নারী। এর মধ্যে ৩৬৭ জনের মৃত্যু হয় এবং আত্মহত্যা করেন ৯০ জন। যৌতুকের কারণে নির্যাতনের শিকার হন ২১৮ জন নারী। যৌন হয়রানি ও উত্ত্যক্তের শিকার হন ২০১ জন নারী। ২০১৯ সালে পরিবারিক নির্যাতনের শিকার হন ৪২৩ জন নারী।

বেসরকারি সংস্থা মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন (এমজেএফ) গত বছর অঘোষিত লকডাউনের সময় মে মাসে ৫৩ হাজার ৩৪০ জন নারী ও শিশুর ওপর টেলিফোনিক জরিপ চালায়। জরিপের তথ্য অনুসারে, ৩১ দিনে দেশের ৫৩টি জেলায় ১৩ হাজার ৪৯৪ জন নারী ও শিশু সহিংসতার শিকার হয়েছে। এর মধ্যে পারিবারিক নির্যাতনই ছিল ১১ হাজার ২৫টি।