The Business Post
বুধবার, অক্টোবর ২০, ২০২১

প্রচ্ছদ খেলা

২০ অক্টোবর ২০২১ ১১:৫৪:১২

প্রতারণায় ক্রিকেটকে ব্যবহার

প্রতারণায় ক্রিকেটকে ব্যবহার

সামিউর রহমান

বাংলাদেশ ক্রিকেটের দীর্ঘ যাত্রায় বিভিন্ন কোম্পানির সাথে সম্পৃক্ত হয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। কিন্তু এসব কোম্পানির সবগুলোই যে ভালো উদ্দেশ্য নিয়ে এসেছে, তা নয়। কখনও কখনও মানুষের আস্থা অর্জনের জন্য ক্রিকেটকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে কোম্পানিগুলো, যা শেষ পর্যন্ত অসংখ্য মানুষের দুর্ভোগের কারণে পরিণত হয়েছে।

এমনই একটি কোম্পানি ইভ্যালি, যার বিরুদ্ধে গ্রাহকদের নির্দিষ্ট সময়ে পণ্য ডেলিভারি না দেয়া এবং সরবরাহকারীদের পাওনা পরিশোধ না করাসহ প্রতারণার নানা অভিযোগ রয়েছে। সবশেষ এ কারণেই বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়াতে বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা ক্রিকেটকে ব্যবহার করেছে বিতর্কিত এ কোম্পানিটি।

চলতি বছরের মার্চ-এপ্রিলে নিউজিল্যান্ড সফরের আগে বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের স্পন্সর হয় ইভ্যালি। বিসিবি’র প্রধান নির্বাহী নিজামউদ্দিন চৌধুরীর জানান, ইভ্যালির সঙ্গে বিসিবির চুক্তি ছিল ২ কোটি টাকার।

ইভ্যালির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মোহাম্মদ রাসেল, তার স্ত্রী ও প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান শামীমা নাসরিন প্রতারণা এবং গ্রাহকদের অর্থ আত্মসাতসহ বিভিন্ন অভিযোগে পুলিশের হেফাজতে রয়েছেন।

শুধু ইভ্যালি-ই নয়, এমন অনেক কোম্পানি বিসিবি আয়োজিত ক্রিকেট ইভেন্টের পৃষ্ঠপোষক হয়েছে। এ তালিকায় রয়েছে- ডেসটিনি, গ্লোবাল নিওয়ে, সাহারা’র নামও। যা এরই মধ্যে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে, উঠেছে অভিযোগও।

মাল্টি-লেভেল মার্কেটিং কোম্পানিটি ডেসটিনি ৪ হাজার কোটি টাকার কেলেঙ্কারি করেছে। প্রতিষ্ঠানটি ২০১২ সালে বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের (বিপিএল) টাইটেল স্পন্সর ছিল। এজন্য বিসিবিকে ৭ কোটি টাকা দেয় প্রতিষ্ঠানটি। ডেসটিনি জাতীয় ক্রিকেট লিগ টি​​-টোয়েন্টি টুর্নামেন্টেও স্পন্সর করেছে।

ডেসটিনির ব্যবস্থাপনা পরিচালক রফিকুল আমিন ৪ হাজার কোটি টাকারও বেশি অর্থ আত্মসাৎ এবং অর্থ পাচারের দুটি অভিযোগে দীর্ঘদিন ধরে কারাগারে রয়েছেন।

একই বছর গ্লোবাল নিওয়ে নামের অপর একটি কোম্পানি আলোচনায় আসে। বিপিএলের তৎকালীন ফ্র্যাঞ্চাইজি সিলেট রয়্যালসের টাইটেল স্পন্সরের জন্য মোটা অংকের টাকা দেয়, যেটা ফ্র্যাঞ্চাইজির নির্ধারিত ফি’র চেয়েও বেশি ছিল!

অন্যান্য ফ্র্যাঞ্চাইজির মতো ফ্র্যাঞ্চাইজি ফি হিসেবে ৭ থেকে ৮ কোটি টাকা দিয়েছে সিলেট রয়্যালস। এরপর ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলো বিসিবি থেকেও অর্জিত মুনাফার ভাগ দাবি করে বলে জানান বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান।

সিলেট রয়্যালসের টাইটেল স্পন্সর হওয়ার জন্য ১০ কোটি টাকা দিয়েছিল গ্লোবাল নিওয়ে।

এখানেই শেষ নয়, পরবর্তীতে কোম্পানিটি ১ কোটি টাকায় ২০১২ সালের এশিয়া কাপে বাংলাদেশ জাতীয় দলের স্পন্সর হয়।

তখন বিসিবি সভাপতি ছিলেন বাংলাদেশ সরকারের বর্তমান অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। এক সংবাদ সম্মেলনে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে চুক্তির ঘোষণা দিয়েছিলেন তিনি।

মাল্টি-লেভেল মার্কেটিং কোম্পানি গ্লোবাল নিওয়ের বিরুদ্ধে ৪০ হাজারের বেশি গ্রাহকের কাছ থেকে অন্তত ১ হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে।

এছাড়াও ২০১২ সালে ভারতের বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের নতুন পৃষ্ঠপোষক হয়ে ওঠে ভারতের সাহারা গ্রুপ। স্পন্সরশিপ স্বত্ত্ব বাবদ ৪ বছরে বিসিবিকে ৯.৪ মিলিয়ন ডলার দেয় ভারতীয় প্রতিষ্ঠানটি।

কিন্তু নির্ধারিত সময়ের ১৫ মাস আগেই ২০১৫ সালের এপ্রিলে সাহারা ইন্ডিয়া পরিবারের সহযোগী অ্যাম্বি ভ্যালির সঙ্গে চুক্তি বাতিল করে বিসিবি। চুক্তির মেয়াদ শেষ হবার আগেই কেন ওই চুক্তিটি বাতিল করা হয়েছে তা জানায়নি ক্রিক্রেট বোর্ড।

বিগত বছর আলোচনায় আসে সাহারার আর্থিক কেলেঙ্কারির বিষয়টি। ভারতের সুপ্রিম কোর্ট গ্রুপটির প্রধানকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। এরপর তাকে তিহার জেলে পাঠানো হয়। বর্তমানে তিনি প্যারোলে আছেন।

ভারতের পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা সেবি’র তথ্যানুসারে, ২৩ হাজার কোটি টাকারও বেশি প্রতারণা করেছে সাহারা গ্রুপ।

বিসিবি ছাড়াও মাশরাফি বিন মুর্তজা, মুস্তাফিজুর রহমানের মতো ক্রিকেটাররা কিছু কোম্পানির ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর হিসেবে কাজ করেছেন। সেসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ রয়েছে।

ক্রিকেটাররা ওইসব প্রতিষ্ঠানের পক্ষে কথা বলায় তারা কোম্পানিগুলোর প্রতি আস্থা রেখেছিলেন বলে জানায় সাধারণ মানুষ।

মাশরাফি ই-অরেঞ্জ নামের অপর একটি বিতর্কিত ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর ছিলেন। যেটি গ্রাহকদের কাছ থেকে অগ্রিম টাকা নিয়ে নির্ধারিত সময়ে পণ্য দিতে ব্যর্থ হয়। এরপর জাতীয় দলের সাবেক এ অধিনায়কের বাড়ির সামনে বিক্ষোভও করেন ক্ষুব্ধ গ্রাহকরা।

বর্তমানে বিসিবি’র টাইটেল স্পন্সরের চুক্তি রয়েছে আলেশা হোল্ডিংসের সঙ্গে, যেটির মেয়াদ ২০২৩ সাল পর্যন্ত।

এদিকে কোম্পানিটির ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম আলেশা মার্টের সঙ্গে ইতোমধ্যেই লেনদেন বন্ধ করে দিয়েছে বেশ কয়েকটি ব্যাংক এবং মোবাইল আর্থিক পরিষেবা। ই-কমার্স নিয়ে নানা অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে যে ১০টি কোম্পানিকে তদন্তের মুখোমুখি করা হয়েছে, এর মধ্যে একটি আলেশা মার্ট।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান মনে করেন, আরও কঠোরভাবে স্পন্সরশিপের নির্দেশনা জারি করে এ ধরনের কোম্পানিগুলোকে প্রতিরোধ করার জন্য ক্রিকেট বোর্ডের আরও দায়িত্বশীল হওয়া উচিত। কারণ ক্রিকেট এবং ক্রিকেটারদের মতামতে সাধারণ মানুষের মাঝে ব্যাপক প্রভাব পড়ে।

মিজানুর রহমান বলেন, মূল ধারণা হলো- একজন ব্যবসায়ী কিংবা ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান হিসেবে আপনি যদি দেখেন, এনিয়ে আপনি অভিযোগ করতে পারবেন না। কারণ বিসিবি দরপত্র দিয়েছে, এ দরপত্রের বিপরীতে কোম্পানি ফি দিতে সম্মত হয়েছে। টাকা কোথা থেকে আসে সেটা বিসিবির দেখার বিষয় নয়। অথবা আপনি বলতে পারেন, কোনো বিক্রেতা যখন কোনো পণ্য বা পরিষেবা বিক্রি করে তখন ক্রেতা কোথা থেকে টাকা পাচ্ছে, সেটিও বিবেচ্য বিষয় নয়।

বিজনেস পোস্ট’কে তিনি আরও বলেন, ক্রিকেট যেহেতু একটি জনপ্রিয় খেলা এবং ক্রিকেটাররা জনপ্রিয়, তাই ইভ্যালি বা ডেসটিনির মতো কোম্পানি তাদের হায়ার করে দেখায় যে, তারাও একটি স্বনামধন্য কোম্পানি। যা একেবারেই মিথ্যা। কারণ ব্যবসায়িক মডেল এমন একটি বিষয়, মানুষের পকেট থেকে টাকা বের করে নেওয়ার জন্যই এটি তৈরি করা হয়েছে।

বিসিবি কোনো তামাক ও অ্যালকোহল উৎপাদনকারী কোম্পানি বা বিপণনকারী প্রতিষ্ঠানকে স্পন্সর হওয়ার অনুমতি দেয় না। অনলাইন জুয়ারি সংস্থাগুলোকেও স্পন্সর হিসেবে নেয় না বিসিবি।

ড. মিজান মনে করেন, বিসিবি’র এ প্রক্রিয়ার আরও কিছু সংশোধন হতে পারে।

তিনি বলেন, আমি মনে করি, একটি দায়িত্বশীল এবং খ্যাতিমান ক্রীড়া সংস্থা হিসেবে বিসিবির স্পন্সর নির্বাচনের জন্য আরও কিছু স্ক্রিনিং প্রক্রিয়া যুক্ত হওয়া উচিত। আপনি দেখুন, বোর্ডকে তার কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। সুতরাং যখন কেউ টাকা নিয়ে আসছে, তখন আপনাকে তা নিতে হবে। কিন্তু যখন একাধিক বিকল্প থাকে, তখন সবচেয়ে ভালো বিকল্প কোনটি, তা নির্বাচনের বিষয়টি নির্ভর করে সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের উপর।