The Business Post
রবিবার, জুন ২০, ২০২১

প্রচ্ছদ জাতীয়

১৯ জুন ২০২১ ১৭:৩৮:০৬

এখনো বাড়ি ফিরতে পারেননি ‘আলো ছড়ানো’ তাসনুভা

এখনো বাড়ি ফিরতে পারেননি ‘আলো ছড়ানো’ তাসনুভা

মুশাহিদ হোসেন তালুকদার

তাসনুভা আনান শিশির। বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম রূপান্তরিত (ট্রান্সজেন্ডার) সংবাদ পাঠিকা। একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলে প্রথম ট্রান্সজেন্ডার হিসেবে সংবাদ পাঠ করেন তাসনুভা। চলতি বছরের ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবসে প্রথমবারের মতো ক্যামেরার সামনে সংবাদ পাঠ করা তাসনুভার উচ্ছ্বাসিত থাকার কথা ছিল। কিন্তু উচ্ছ্বাসের বদলে তার চোখে ঝরেছে আনন্দাশ্রু। সেই অশ্রু ছুঁয়ে গেছে দেশের আপামর জনগোষ্ঠীকে।

প্রথম ট্রান্সজেন্ডার সংবাদ পাঠিকা হিসেবে ইতিহাস গড়তে তাসনুভাকে পাড়ি দিতে হয়েছে অনেক দীর্ঘ পথ, করতে হয়েছে ঘাম ঝরানো পরিশ্রম। কঠিন এ লড়াইয়ে কাউকে পাশে পাওয়া তো দুরের কথা, উল্টো যাদেরকে পাশে পাবার কথা ছিল তাদের কাছ থেকে মিলেছে অবজ্ঞা-অবহেলা। মেলেনি পরিবারের সমর্থন পর্যন্ত। পেয়েছেন লাঞ্ছনা-বঞ্চনা ও তুচ্ছতাচ্ছিল্য, পদে পদে হয়েছেন হয়রানির শিকার।

সহপাঠী, পরিবার ও সমাজের তুচ্ছতাচ্ছিল্যে তাসনুভা ব্যথিত হয়েছেন। তবে এসবে দমে যাননি। বরং ঘুরে দাঁড়ানোর মানসিকতা ও কিছু একটা করে দেখানোর তাগিদে করেছেন দিনরাত পরিশ্রম। হেঁটেছেন স্রোতের বিপরীতে, গড়েছেন ইতিহাস। নাহলে তাসনুভাও হয়তো হারিয়ে যেতেন তার মতো অন্যান্যদের ভীড়ে।

ট্রান্সজেন্ডার সম্প্রদায়ের জন্য তাসনুভা যেন হাজির হয়েছেন আলোকবর্তিকা হাতে। সে আলোকবর্তিকা যেমন আলো ছড়িয়েছে, তেমনি দিয়েছে দিন বদলের বার্তাও। তাসনুভার সাফল্যগাঁথা নিয়ে সংবাদ ছেপেছে বিভিন্ন গণমাধ্যম। এতকিছুর পরেও বদলানো যায়নি সমাজব্যবস্থা। ফেরেনি তাসনুভার পরিবার, হয়নি বাড়ি ফেরা। আলোর মশাল হাতে ‘আলো’ ছড়ানো তাসনুভা এখনো যেন প্রদীপের নিচের অন্ধকার অংশ হয়েই রয়ে গেছেন!

বিজনেস পোস্ট’কে দেয়া সাক্ষাৎকারে তাসনুভা তুলে ধরেছেন তার জীবনের জানা-অজানা নানা কথা 

তাসনুভা বলেন, ‘না, আমি এখনো বাড়ি যাইনি। আসলে যেটা হয়, প্রদীপ যতই আলো দিক না কেন, প্রদীপের তলায় কিন্তু অন্ধকার থাকে। ব্যাপারটা কিন্তু ওইরকম। আমার পরিবার খুবই মফস্বল এলাকায় থাকে এবং খুবই রক্ষণশীল। সেখানে মানুষের বোঝার জায়গাটা কিন্তু খুব বেশি না। সেখানে গিয়ে আসলে আশেপাশের মানুষের কেমন আচরণের মুখোমুখি হবো সেটাও একটা বিষয়। আবার বাবাও অসুস্থ। কি হবে, না হবে ওই রিস্কটা আমি নিতে চাচ্ছি না। শিক্ষিত সমাজের অনেক মানুষই ব্যাপারটাকে ভালোভাবে নেয় না, সেখানে একটা অজপাড়াগাঁয়ের একজন মানুষ কিংবা অজপাড়াগাঁয়ের সমাজ এটাকে কিভাবে নেবে সেটা নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন। সবকিছু চিন্তা করে আসলে যাওয়া হয়নি।’

সাত বছর ধরে বাড়ি ফেরা না হলেও সন্তান হিসেবে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে কোনো কার্পণ্য করেননি তাসনুভা। প্রত্যেক মাসেই উপার্জনের একটা অংশ বাড়িতে পাঠান বাবা-মায়ের জন্য। তিনি বলেন, ‘আমি তো আমার মায়ের জন্য কন্ট্রিবিউশন ঠিকই করছি। একজন সন্তান হিসেবে যতটুকু দায়িত্ব পালন করা দরকার সেটুকু আমি সবসময়ই করে আসছি বা করছি। এখন তারা বাবা-মা হিসেবে কতটুকু দায়িত্ব পালন করেছেন বা করতে পারেননি সেই জবাদিহিতার জায়গা তো তাদের, তাই না?’

তাসনুভার জন্ম বাগেরহাট জেলার মোংলা উপজেলায়। ‘পুরুষের’ বৈশিষ্ট্য নিয়ে জন্ম নেওয়ায় বাবা-মা নাম রাখেন কামাল হোসেন শিশির। কিন্তু তাসনুভা বেড়ে উঠতে থাকেন মেয়েলি স্বভাব নিয়ে। তথাকথিত ‘মেয়েলি আচরণ’ যখন স্পষ্ট হতে শুরু করে, তখন থেকেই সমাজ দ্বারা নিপীড়িত হতে থাকেন তিনি। নিপীড়নের শিকার হওয়ায় এসএসসি পাশ করেই পরিবার ছাড়তে বাধ্য হন তিনি।

সামাজিক হয়রানি এড়াতে তাসনুভাকে নারায়ণগঞ্জে চাচার বাসায় পাঠিয়ে দেন তার বাবা-মা। কিন্তু সেখানেও টিকে থাকার জন্য লড়াই করতে হয়েছে নানামুখী প্রতিবন্ধকতার সঙ্গে, রাত কাটাতে হয়েছে বস্তির অন্ধকার ঘরে। তবে সকল প্রতিবন্ধকতাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে আপন গতিতে এগিয়ে যান তাসনুভা। নারায়ণগঞ্জের তোলারাম কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করেন। একই প্রতিষ্ঠান থেকে সমাজকর্মে সম্পন্ন করেন স্নাতকোত্তর।

তাসনুভা বলেন, ‘প্রথমে চাচ্চুর (চাচা) বাসায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিলো। সেখানে আবার একই সমস্যাগুলো হচ্ছিল। বৈষম্য, বডি শেমিং, বুলিং- এই ধরণের হয়রানি। এগুলোই ঘটছিল। তারপর যেটা হয়, একবার কাজিনদের সাথে আমার খুব ঝগড়া হয়। এরপর আমাকে বাসা থেকে বের করে দেওয়া হয়। তখন আমি ইন্টারমিডিয়েটে পড়ি। বাসা থেকে যখন বের করে দেওয়া হয়, তারপর বস্তিতে ছিলাম। প্রায় সাত-আটদিন বস্তিতে ছিলাম। খাবার নাই, বাসা নাই। সে এক ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা। আমার এক শিক্ষক ছিলেন, উনি আমাকে একটা টিউশনির ব্যবস্থা করে দেন। তারপর একটা মেস ঠিক করে দেন। ওখানে থাকা শুরু করি। কিন্তু ওখানে বেশিদিন থাকতে পারলাম না। কারণ আমি ওরকম পরিবেশে অভ্যস্ত ছিলাম না। তারপর ছোট্ট একটা বাসা নেই। ওই টিউশনিগুলো করতে থাকি। টিউশনি যে খুব বেশি করতে পারছিলাম তা না। একমাস পড়ালাম, তার পরের মাসে না করে দিলো। আবার পরের মাসে নতুন টিউশনি খুঁজতে হতো। এইরকম করে চলতো।’

নারায়ণগঞ্জ থাকতেই থিয়েটারের সঙ্গে যুক্ত হন তাসনুভা। এখনো নিয়মিত থিয়েটার করছেন। তাসনুভা জানান, থিয়েটার করার সুবাদেই সংবাদ পাঠিকা হিসেবে কাজ করার সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি। তাই থিয়েটার ও অভিনয় ছাড়া জীবনকে চিন্তাই করতে পারেন না।

তাসনুভার ভাষায়, ‘আমি অভিনয় করি এবং অভিনয়টাই করতে চাই। থিয়েটার না করলে তো আমি সংবাদ পাঠিকা হতে পারতাম না। কারণ আমি সংবাদ পাঠের কোনো কোর্স করি নাই। কোনো ধরনের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নাই। যতটুক যোগ্যতা বা দক্ষতা যদি বলেন সেটা সম্পূর্ণ আমার থিয়েটার থেকে। সে তুলনায় অভিনয় বাদ দিলে জীবন চিন্তা করা মুশকিল। তবে সংবাদ পাঠ করাটাও আমি বেশ উপভোগ করি। অভিনয়ের পাশাপাশি আমরা তো অনেককিছুই করি। সংবাদ চাইলে সারাজীবনই পড়া যায়। দুটো নিয়ে কোনো দ্বন্দ্ব নেই।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমি ২০০৭ সাল থেকেই থিয়েটার করি। নারায়ণগঞ্জে একটা থিয়েটার দিয়ে যাত্রা শুরু করেছিলাম। তারপরে তো ঢাকা, ঢাকার বাইরে, কলকাতায় সব মিলিয়ে অনেকগুলো ওয়ার্কশপ করেছি। এখন বটতলা থিয়েটারের সাথে কাজ করছি।’

সংবাদ পাঠিকা হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার জন্য যথাযথ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই যেতে হয়েছে তাসনুভাকে। তিনি বলেন, ‘আমাদের একজন পরিচালক ছিলেন। উনি একটা প্রোডাকশনের দায়িত্ব নিয়েছিলেন। চয়নিকা চৌধুরী আপা। বৈশাখী টিভির সাথে উনি একটা প্রোডাকশনের পরিকল্পনা করছিলেন। সেটাতে আমার অভিনয় করার কথা ছিল। তারপর আমি বৈশাখীতে যাই। তখন ওনারা বললেন যে, ‘‘ওর উচ্চারণ সুন্দর। অডিশন দিবে কিনা দেখো। ও ভালো করবে হয়তো।’’ এরপর অডিশন দিলাম। তারপর যেটা হয় আর কি, অন্যান্য ছেলে-মেয়েদের মতো সব ধরণের প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই এখানে আসতে হয়েছে।’

প্রতিবন্ধকতা ও সামাজিক বৈষম্যের মধ্যেও সংবাদ পাঠিকা হিসেবে আত্মপ্রকাশের পর যে একটা পরিবর্তন এসেছে সেটা মানছেন তাসনুভা নিজেও। তিনি বলেন, ‘পজিটিভ পরিবর্তন যদি বলি, অবশ্যই এটা একটা ভালো দিক। সমাজে মানুষের মধ্যে একটা চিন্তার জায়গা তৈরি হলো যে আমরা সুযোগ পেলে আরও ভালো কিছু করে দেখাতি পারি। সেখান থেকে অবশ্যই ভালো একটা জায়গা হয়েছে। সেক্ষেত্রে যেটা হয়েছে আগে যেহেতু অভিনয়টাই করতাম, এখনো অভিনয় করছি। অনেক কাজের প্রস্তাব পাচ্ছি। সেখান থেকে বাছাই করতে হচ্ছে কোন কাজটা আমি করবো কিংবা কোন কাজটা আমার জন্য নয়। কাজের পরিধি বেড়েছে। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যেতে হয়, মানুষজন ডাকে। আগে যেরকম ডাকতো এখন তার চেয়ে দ্বিগুণ ডাকছে। বিভিন্ন জায়গায় ভূমিকা পালনের জায়গাটা আরও প্রসারিত হলো। সবচেয়ে বড় পরিবর্তন যদি বলি, আমরাও যে কিছু করতে পারি এটা প্রমাণ করার জায়গা তৈরি হয়েছে।’

গণমাধ্যমে তাসনুভাকে নিয়ে আলোচনা শুরু হয় মার্চের প্রথম সপ্তাহের দিকে। তখন থেকেই তাসনুভা বলে আসছিলেন ট্রান্সজেন্ডার সম্প্রদায়ের জন্য কিছু করতে চান তিনি। সে লক্ষ্য থেকে সরে যাননি তাসনুভা। বরং বাড়িয়েছেন কাজের পরিধি। আত্মপ্রচার ছাড়াই নীরবে কাজ করে যাচ্ছেন ট্রান্সজেন্ডার সম্প্রদায়ের মানুষদের নিয়ে। তাসনুভা পরিকল্পনা করছেন আরও বড় পরিসরে সমাজের অবহেলিত এই মানুষদের নিয়ে কাজ করার। তাসনুভা জানান, কোনো স্বার্থের জন্য নয়, নিজে এই প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হয়ে এসেছেন বলেই কাজটা করতে চান তিনি।

ট্রান্সজেন্ডার সম্প্রদায় নিয়ে নিজের পরিকল্পনার কথা জানিয়ে তাসনুভা বলেন, ‘আমার ছোট্ট একটা প্লাটফর্ম আছে, যেটার নাম হচ্ছে শ্রী ভয়েস অব সেক্সুয়াল মাইনরিটি। আমি এটা নিয়ে করোনার সময় কাজ করেছি। বিভিন্ন জায়গা থেকে ফান্ডিং করে তাদের জন্য খাবার দিয়েছি। নগদ অর্থসহায়তা দেওয়ার চেষ্টা করেছি। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন অর্গানাইজেশনের সঙ্গে মিলে কাজ করেছি। তারপর তাদের কর্মসংস্থানের জন্যও বিভিন্ন অর্গানাইজেশনের সঙ্গে সম্মিলিতভাবে কাজ করেছি। ভবিষ্যতে আমার শ্রী নিয়ে বড় ধরনের পরিকল্পনা আছে। যাতে করে এই মানুষগুলোর কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি এবং সমাজে সচেতনতা বৃদ্ধি করা যায়। অন্যান্য অর্গানাইজেশন যারা বিভিন্ন প্রজেক্ট করে তাদের অনেকে হয়তো নিজেদের স্বার্থের জন্য কাজ করে। কিন্তু ট্রান্সজেন্ডার কমিউনিটির মানুষ হিসেবে আমি নিজেই  বিভিন্ন অনাকাঙিক্ষত পরিস্থিতির সম্মুখীন করেছি। সেখান থেকে আসলে মনে হয়েছে যে, নিজে যখন সম্মুখীন হয়েছি তখন এই জায়গাটা ডেপলপ করলে নিজে কাজ করতে পারবো আরও ভালোভাবে। সে জায়গা থেকেই এই চিন্তা থেকে কাজটা করতে চাই।’